১৫ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে বন্ধ পাঁচটি

হালনাগাদ আর্থিক তথ্যের অভাবে অন্ধকারে সামিট পাওয়ারের বিনিয়োগকারীরা

দেশের বিদ্যুৎ খাতে সামিট পাওয়ার লিমিটেডের যাত্রা আড়াই দশকের কিছু বেশি। এর মধ্যে শুরুর দেড় দশকের তুলনায় শেষের দশকে কোম্পানিটির ব্যবসায়িক উল্লম্ফন হয়েছে সবচেয়ে বেশি। মূলত বিগত

দেশের বিদ্যুৎ খাতে সামিট পাওয়ার লিমিটেডের যাত্রা আড়াই দশকের কিছু বেশি। এর মধ্যে শুরুর দেড় দশকের তুলনায় শেষের দশকে কোম্পানিটির ব্যবসায়িক উল্লম্ফন হয়েছে সবচেয়ে বেশি। মূলত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নেয়া বিদ্যুৎ খাতে আইপিপি-নির্ভর অনুকূল নীতিকে কাজে লাগিয়ে সামিটের বিদ্যুৎ ব্যবসা বড় হয়েছে। তবে গত আগস্টে আওয়ামী সরকারের পতনের পর ব্যবসায়িকভাবে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে কোম্পানিটি। এরই মধ্যে বেশকিছু তদন্ত চলছে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির মালিকানায় থাকা ১৫টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে পাঁচটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। হালনাগাদ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করার কারণে কোম্পানিটির আর্থিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিয়ে অন্ধকারে রয়েছেন পুঁজিবাজারে সামিটের বিনিয়োগকারীরা। সবকিছু মিলিয়ে প্রথমবারের মতো ব্যবসায়িকভাবে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে সামিট পাওয়ার।

স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সামিট পাওয়ার গত রোববার বিনিয়োগকারীদের পাঁচটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ থাকার বিষয়টি সম্পর্কে জানায়। কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ১৬৮ মেগাওয়াট। এর চারটি গ্যাসভিত্তিক ও একটি এইচএফও-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এর মধ্যে কোনোটি গ্যাসস্বল্পতার কারণে, কোনোটির চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে এবং কোনোটি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য চাহিদা না পাওয়ার কারণে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

সামিট পাওয়ারের মালিকানাধীন আশুলিয়া (ইউনিট-১), মাধবদী (ইউনিট-১) ও চান্দিনা (ইউনিট-১) বিদ্যুৎ কেন্দ্র তিনটির চুক্তির মেয়াদ গত বছরের ৩১ আগস্ট শেষ হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক এ তিন কেন্দ্রের প্রতিটির সক্ষমতা ১১ মেগাওয়াট। ২০২৮ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্টের’ ভিত্তিতে কেন্দ্র তিনটির বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মেয়াদ নবায়ন করা হয়েছে। তবে গ্যাসস্বল্পতার কারণে চুক্তি নবায়নের সময় থেকেই কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

সামিট পাওয়ারের জাঙ্গালিয়া ৩৩ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২৪ জুন। বিপিডিবির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রটির উৎপাদন পুনরায় শুরু কিংবা চুক্তি নবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এর ফলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে।

সামিট পাওয়ারের নারায়ণগঞ্জের মদনগঞ্জ ১০২ মেগাওয়াট এইচএফও-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২২ মার্চ। এরপর গত ১ মে থেকে নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট ভিত্তিতে কেন্দ্রটি চালু রাখা হয়। তবে বিপিডিবির পক্ষ থেকে এ বছরের আগস্টের মাঝামাঝি থেকে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ নেয়ার জন্য কোনো চাহিদা পাঠানো হয়নি। এ কারণে কেন্দ্রটিতে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে সামিট পাওয়ার।

সামিট পাওয়ারের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, কোম্পানিটির শতভাগ মালিকানাধীন এবং অঙ্গ ও সহযোগী কোম্পানির মালিকানায় থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ১৫। এর মধ্যে বর্তমানে পাঁচটি বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে আশুলিয়া (ইউনিট-২), মাধবদী (ইউনিট-২), চান্দিনা (ইউনিট-২), রূপগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাওনা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও উল্লাপাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে সামিট পাওয়ারের শতভাগ মালিকানাধীন। আর অঙ্গ ও সহযোগী কোম্পানির মালিকানায় থাকা চালু বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইউনিট-২, বরিশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এসিই অ্যালায়েন্স বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও গাজীপুর-২ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এছাড়া খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (কেপিসিএল) দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে (ইউনিট ২ ও ৩) ১৭ দশমিক ৬৪ ও সামিট মেঘনাঘাট ইউনিট-১ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩০ শতাংশ শেয়ারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি সামিট পাওয়ারের ইকুইটি বিনিয়োগ রয়েছে।

দেশের পুঁজিবাজারে সামিট পাওয়ার তালিকাভুক্ত হয় ২০০৫ সালে। বর্তমানে কোম্পানিটির ৬৩ দশমিক ১৮ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। আর বাকি ৩৬ দশমিক ৮২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের তথ্য জানার নির্ভরযোগ্য উৎস হচ্ছে স্টক এক্সচেঞ্জ, কোম্পানির অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ও আর্থিক প্রতিবেদন। কিন্তু বর্তমানে সামিট পাওয়ারের বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিটির গত ছয় মাসের আর্থিক ও ব্যবসায়িক অবস্থা সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছেন। কারণ কোম্পানিটির সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৩-২৪ হিসাব বছরে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ও চলতি ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পাশাপাশি সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিবে কিনা সেটিও জানতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। এসব অনিশ্চয়তার মধ্যে এ বছরের ৬ আগস্ট থেকে গত রোববার পর্যন্ত সামিট পাওয়ারের শেয়ারদর কমেছে ২২ শতাংশের বেশি। কোম্পানিটির শেয়ারের সর্বশেষ দর দাঁড়িয়েছে ১৫ টাকা ৮০ পয়সায়।

জানতে চাইলে সামিট পাওয়ারের কোম্পানি সচিব স্বপন কুমার পাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিয়ম অনুসারে এ বছরের অক্টোবরের মধ্যে আমাদের পর্ষদ সভা করার কথা ছিল। কিন্তু আমরা সেটি করতে পারিনি। আমাদের নিরীক্ষা কার্যক্রম এখনো শেষ করা সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে নিরীক্ষাসংক্রান্ত দু-একটি ইস্যু রয়েছে। পাশাপাশি আমাদের কোম্পানির বিষয়ে বিভিন্ন তদন্ত কার্যক্রম চলছে। তাছাড়া বিপিডিবির কাছ থেকেও বিদ্যুৎ বিক্রির টাকা পেতে কিছুটা সময় লাগছে। সবকিছু মিলিয়ে আমরা বিএসইসির কাছে নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময়সীমা বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছিলাম। কমিশনের পক্ষ থেকে আমাদের আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে আমরা নিরীক্ষিত প্রতিবেদন ও অনিরীক্ষিত প্রান্তিক প্রতিবেদন জমা দিয়ে দেব।’

সামিটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বপন কুমার পাল বলেন, ‘তালিকাভুক্ত কোম্পানি সামিট পাওয়ারের অধীনে ১৫টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোর সক্ষমতা ৯৩০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বর্তমানে পাঁচটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ২০২৮ সালের আগে আমাদের আর কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে না।’

তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে হিসাব বছর শেষ হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা, নিরীক্ষা সম্পন্ন করা, পর্ষদে অনুমোদনের পর প্রকাশ করার ১৪ দিনের মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে পাঠানোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যত্যয় হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার রয়েছে বিএসইসির। তাছাড়া কোম্পানির ব্যবসায়িক ও আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা গেলে সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য পদক্ষেপ নেয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সামিট পাওয়ারের বিষয়গুলো সম্পর্কে কমিশন অবগত। আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়া না হলে সেক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি বিএসইসি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় আন্তরিক। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হবে।’

সামিট পাওয়ারের সর্বশেষ প্রকাশিত অনিরীক্ষিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ মার্চ শেষে সামিট পাওয়ারের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৮৩১ কোটি টাকায়। এ সময়ে কোম্পানিটির সংরক্ষিত আয় (রিটেইন্ড আর্নিংস) ছিল ২ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। কোম্পানিটির স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ৮১২ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) বিদ্যুৎ বিক্রি করে সামিট পাওয়ারের আয় হয়েছে ৩ হাজার ২৯ কোটি টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৪ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটি কর-পরবর্তী ৪৪১ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়েছে, যা আগের হিসাব বছরের একই সময়ে ছিল ২৯৬ কোটি টাকা।

দেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষ স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী (আইপিপি) প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার লিমিটেড প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৯৭ সালে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে প্রথম উৎপাদনে আসে সামিটের তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র। সে সময় কোম্পানিটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩৩ মেগাওয়াট। সর্বশেষ চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুসারে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৯৩০ মেগাওয়াটে। সামিট পাওয়ারের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ৩৪তম ধনী হিসেবে ফোর্বসের তালিকায় জায়গা করে নেন। সে বছর তার সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি ডলার। এর পর থেকে প্রতি বছরই তিনি এ তালিকায় স্থান পেয়েছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ৫০ ধনীর তালিকায় আজিজ খানের অবস্থান ছিল ৪৩তম। ফোর্বসের হিসাবে ২০২৪ সালে তার সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১০ কোটি ডলারে। তার সম্পদের বড় অংশই এসেছে বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসা থেকে।

তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে মুহাম্মদ আজিজ খানের সঙ্গে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

আরও